হিন্দু জাতীয়তাবাদ

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
Published on : 5/25/2021 1:27:00 AM


সিন্ধু নদের তীরে গড়ে ওঠা সভ্যতার বিকৃত গ্রীক উচ্চারণই "হিন্দু" যা পরবর্তীতে সুবিশাল ভারতবর্ষের অধিবাসীদের চিহ্নিত করেছে (হিন্দুধর্ম উইকিপিডিয়া; https://bn.m.wikipedia.org/wiki/হিন্দুধর্ম) । উৎপত্তিগতভাবেও "হিন্দু" কখনই একটিই জাতি বা জনসম্প্রদায় নয়। আর্য, দ্রাবিড়, শক, হূন, অসুর, কিরাত, শবর, বনবাসী, আদিবাসী প্রভৃতি সকলেই নিজ নিজ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যসমেত "হিন্দু" (হিন্দুধর্ম উইকিপিডিয়া; https://bn.m.wikipedia.org/wiki/হিন্দুধর্ম)। অবশ্যই কালের স্বাভাবিক নিয়মে, রাজনৈতিক উত্থান-পতনের অনিবার্য ফলস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রাধান্য গুরুত্ব পেয়েছে। সুতরাং বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত কিন্তু সিন্ধু নদের তীরের সুবিশাল ভূ-খণ্ডের সভ্যতা যা এই সকল জনগোষ্ঠীকে এক মহৎ ও উদার আদর্শে অনুপ্রাণিত করেছে ও করে চলেছে, এবং যে আদর্শে এই সকল জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ সেই আদর্শই "হিন্দু", সেই আদর্শের অনুসরণই "হিন্দুত্ব" (The Principles of Hindu Ethics; http://www.jstor.org/stable/2377977)।
হিন্দুরা নিজেদের ধর্মকে "সনাতন" ধর্ম বলে উল্লেখ করেন। ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিক থেকে যা শাশ্বত, চিরকালীন, আদি তাই সনাতন। নামকরণের সার্থকতা একেই বলে! কোনও বিশেষ ধর্ম, জাতি, গোষ্ঠী নয়, মানব ধর্মের আদি বিমূর্ত বিশেষণ জ্ঞাপক "সনাতন" শব্দটি চয়ন করার প্রবণতাই প্রমাণ করে ধর্মটি উদার এবং সংস্কৃত। ধর্মটি প্রথমেই সংজ্ঞায়িত করে ধর্ম শব্দটিকে। ধর্ম সম্বন্ধীয় প্রচলিত ধারণাকে (ধর্ম উইকিপিডিয়া; https://bn.m.wikipedia.org/wiki/ধর্ম) সমর্থন করে না হিন্দুরা। হিন্দুর সংজ্ঞায় এবং অবশ্যই যৌক্তিক ব্যুৎপত্তিগত অর্থে যা (কল্যাণের জন্য) ধারণ করা হয়, তাই ধর্ম। কার কল্যাণ? অবশ্যই "স্ব" বা নিজের, কিন্তু এই "স্ব" শব্দের অর্থটির বিস্তার ব্যাপক। পরিবারের অতি ঘনিষ্ঠ সকলের মধ্যে "স্ব" স্বয়ং (স্ব+অয়ং=নিজের আত্মা)। জ্ঞাতি সকলের পরিবার গুলির মধ্যে "স্ব" নিজ পরিবার, গ্রামসকলের মাঝে নিজ গ্রাম, দেশ সকলের মাঝে স্বদেশ, গোত্র সকলের মাঝে স্বগোত্র। অর্থাৎ নির্দেশ-তন্ত্র (frame of reference) যত বড়, "স্ব" শব্দের বিস্তারও আনুপাতিক হারে ততই বিস্তৃত।
এখন সংজ্ঞায়িত এই ধর্মের দায়টি কার তাও "সনাতন" ধর্ম নির্দেশ করেছে সুন্দরভাবে। ন্যূনতম যে তিনটি গুণ থাকলে "নর" বা মানুষ পদবাচ্য তা হল, শিশ্ন (প্রজনন ও প্রতিপালন যা গোষ্ঠীর বৃদ্ধি ঘটায়), উদর (ক্ষুৎনিবৃত্তি যা নিজের পুষ্টি যোগায় এবং সুস্থ রাখে) এবং ধর্ম। অর্থাৎ প্রাণীমাত্রই প্রথম দুইটি গুণের অধিকারী, তা না হলে সৃষ্টি ধ্বংস হত। এই তৃতীয় গুণটি অর্থাৎ কল্যাণের তাগিদ যার আছে সেই নর তথা মানব, ধর্ম পালনের দায় তাই তারই (মৎগুরু শ্রী সুনীল কৃষ্ণ দেবশর্মণ কথিত)।
এই উদার যৌক্তিক সংজ্ঞা যিনিই গ্রহণ করেন তিনিই হিন্দু, সেজন্য হিন্দু ধর্মে তথাকথিত ধর্মান্তরণের কোনও পদ্ধতি নেই (মৎগুরু শ্রী সুনীল কৃষ্ণ দেবশর্মণ কথিত)।
সুতরাং একটি নির্দিষ্ট জাতি, সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠী যখন নয়, তখন সেই সংস্কৃতির মানুষের তথাকথিত জাতীয়তাবাদ অলীক। বরং দেশাত্মবোধ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এই সব শব্দ অধিক প্রযোজ্য এবং যুক্তিযুক্ত। এবং এভাবেই প্রমাণ হল যে এই আদর্শকে যিনি মানেন তিনি মুসলিম, খ্রীষ্টান যে সম্প্রদায়ভুক্ত হোন না কেন, তিনি হিন্দু বা সনাতন ধর্মের অনুসারী। যা হোক, "হিন্দু জাতীয়তাবাদ" এই আকাশকুসুম শব্দবন্ধের পরিবর্তে যদি হিন্দুত্ব বা হিন্দু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ এইরকম জুতসই শব্দ প্রয়োগ করা হয় তবে অবশ্যই তার সুস্পষ্ট একটা সংজ্ঞা নিরূপণ সম্ভব, সম্ভব তার দিকনির্দেশনা এবং অবশ্যই তার যথার্থতা।
হিন্দুত্ব সম্পর্কে সাম্প্রতিক কালে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ যথোপযুক্ত, যৌক্তিক এবং নির্দ্বিধায় গ্রাহ্য (Hindutva Wikipedia; https://en.m.wikipedia.org/wiki/Hindutva)। এইটি অবিকৃত রূপে গ্রহণ করে হিন্দু ধর্মের সনাতনী প্রাথমিক সংজ্ঞাগুলি অবহিত ও যথাযথ অবগত হলে সম্যকভাবেই হিন্দুত্বের সংজ্ঞা নিরূপিত হয়। অবহিত এবং অবগত দুই শব্দের প্রয়োগের কারণ, আচার-সংস্কার আমাদের আমাদের অবগত (অনুভব বা উপলব্ধি) করায় হয়তো, কিন্তু অবহিত (ভাষায় প্রকাশযোগ্য) না থাকায় সৎ ধর্মের রক্ষায় সমস্যা হয়। আবার অবহিত আচার সর্বস্ব যিনি এর সারবত্তা অন্তরে উপলব্ধি করেন না (অর্থাৎ অবগত হন না) তিনি অপব্যাখ্যায় রত হন অথবা অ-ধর্ম আচরণ করেন। এই দুইয়ের উদাহরণ সাম্প্রতিক ঘটনাবলী থেকেই দেওয়া যেতে পারে। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত খবর "মুসলিম শিশুকে দত্তকের 'শাস্তি', ১৬ বার ছুরি বাবাকে" (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৯শে জুন, 2018; https://www.anandabazar.com/national/hyderabad-man-stabbed-16-times-for-allegedly-adopting-a-muslim-girl-dgtl-1.824229?ref=hm-editorschoice)। রবিকান্তবাবু এক্ষেত্রে হিন্দুধর্মের মূল সংজ্ঞা উপলব্ধি করেছেন (অবগত) হয়তো অবহিত নন কারণ ধর্মের এই দৃঢ় সত্যের বদলে ওনার গলায় উঠে এসেছে মন্দিরে দান করে নিজ সম্প্রদায়ের বিরোধিতার প্রশমনের প্রচেষ্টার কথাই। যদিও হিন্দু ও মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়ের লোকজনই এই মানবিক কাজটির বিরুদ্ধে, কিন্তু প্রকৃত হিন্দুত্ব এই মানবিক কাজের বিরুদ্ধবাদীদের কখনই সমর্থন করে না। এ ব্যতিরেকেও 'দত্তক' নেওয়া শিশুর পরিচয় তার পালক বাবা-মায়ের পরিচয়ে, এক্ষেত্রে যে বা যারা হিন্দুত্বের নামে রবিকান্তবাবুর বিরুদ্ধে তারা হিন্দুত্বের ক্ষতি সাধন করছেন সজ্ঞানে। অর্থাৎ হয়তো হিন্দুত্বের এই ধ্বজাধারীগণ হিন্দুত্বের সংজ্ঞা শুধুই 'অবহিত', 'অবগত' নন।
সংজ্ঞা নিরূপিত হল যখন, হিন্দু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের তাহলে অবশ্যই একটি উদ্দেশ্য ও অভিমুখও বর্তমান। সেই উদ্দেশ্য 'অনন্ত শান্তি' যা কখনও মোক্ষ নামে অভিহিত হয়েছে তো কখনও নির্বাণ। এই মোক্ষলাভের যৌক্তিক পথটি জ্ঞানের, বিদ্যার, বিতর্কের এবং আলোচনার। এই পথটিকে সনাতনীগণ চিরকাল প্রাধান্য দিয়েছেন, বাকি যেসকল 'আচার-ধর্ম' তাকেও অস্পৃশ্য বলে দূরে ঠেলে দেওয়া হয় নি বলেই হিন্দু ধর্মের মূল সুরকে বোঝার জন্য উদার আন্তরিকতা প্রয়োজন। "একদিকে বিশুদ্ধ তত্ত্বের জীবন, আর-এক দিকে ব্যবহারিক প্রয়োজনের জীবন--দুটোই সমান্তরাল রেখায় আমাদের মনের মধ্যে বয়ে চলেছে।" (ড: অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বাঙালীর ধর্ম ও দর্শনচিন্তা)। আমাদের জীবনে তাই মোক্ষের অন্বেষণ থাকেই কিন্তু তা ব্যবহারিক প্রয়োজনকে অস্বীকার করেও নয়, আর তাই সে অন্বেষণ "শুষ্কম কাষ্ঠং" নয়, নিত্য রসের আনাগোনায় আর্দ্র।
আসলে হিন্দুধর্ম কখনই অস্পৃশ্যতাকে প্রশ্রয় দেয় না, দেয় নি। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ অপরাপর মানুষদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে এই ধরণের প্রথার সৃষ্টি করে হিন্দু ধর্মের বদনাম করেছে। হিন্দু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের প্রথম উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ এই ধরনের ভ্রান্তি দূর করা। এরকমই ভ্রান্তি দূর করে চিরস্মরণীয় রাজা রামমোহন রায় (সতীদাহপ্রথা), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর(বিধবাবিবাহ)। অবশ্যই এ বড় সহজ কাজ নয়। অজস্র তথাকথিত শাস্ত্রের ভীড়ে সঠিক যৌক্তিক বিচার নিরলস সাধনারই নামান্তর, যাকে গবেষণা বলা যেতেই পারে। আজ পৃথিবীর একমাত্র সজীব প্রাচীন ধর্মের অনুরাগে এই অন্বেষণ করা যেতেই পারে এবং উচিৎ।
আমার গুরু শ্রীমৎ সুনীলকৃষ্ণ দেবশর্মণের একটি উদাহরণ তোলা যাক এই আলোচনার শেষে। নীল পূজার সময় এক চণ্ডাল সন্ন্যাস নেওয়ায় এক শিষ্যের একটু দ্বিধা ছিল ছোঁয়া-ছুঁয়ি বা অস্পৃশ্যতা বিষয়ে। তো গুরু বললেন, হিন্দু ধর্ম (সমাজ) একটা শরীর। তো শরীরের মল যদি বের না করা যায় শরীর পরিষ্কার হয় না, শরীর টেঁকে না। সেই কাজ করে গুহ্যদ্বার। এখন গুহ্যদ্বার তার কাজ করে বলেই শরীর সুস্থ, মন শান্ত। কিন্তু তাই বলে গুহ্যদ্বারকে কেউ চুম্বনও যেমন করে না, আবার অপরিষ্কারও রাখে না, আবার পরিষ্কার করার পর হাতও ধোয় ভালো করে। অস্পৃশ্য ভেবে গুহ্যদ্বার তো কেউ পরিত্যাগ করে না। সেরকমই সমাজের শরীরের বিভিন্ন কাজও বিভিন্ন জন করে স্ব স্ব বৃত্তি ও ক্ষমতা অনুসারে। সেই ব্যক্তি যখন তার বৃত্তিতে রত তখন তার উপর সেই বৃত্তির অধিকার। সেজন্যই পূজায় রত থাকাকালীন পূজক শুচি, শবদাহের সময় চণ্ডাল অশুচি। কিন্তু সেই বৃত্তির বাইরে সে নিজেকে স্নাত শুদ্ধ করে এল, তার অশুচিতা দূর হল, তেমনই পূজক শুদ্ধাচারী অপকর্মে লিপ্ত হলে নষ্ট হল তার শুচিতা। অস্পৃশ্যতা তাই বৃত্তির, মানুষের নয়। যিনি মনে মলকে(অপকর্ম, কু-চিন্তা) জমিয়ে রাখেন তিনিই অস্পৃশ্য। বাইরের মলকে যিনি পরিষ্কার করে জগৎ শুচি করেন তার অস্পৃশ্যতা স্নানমাত্রেই দূর হয়।








Card image cap     Tuesday, January 18, 2022
Events & Remarks


 

User Name:  

Passkey :  



Forget Passkey

Change Passkey

মন্তব্য, বিতর্ক ও আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন বা সাইন আপ করুন
Login/Sign Up to Remarks or to take part in Discussion/Debate.