অমর ভারত কথা

জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়
Published on : 12/3/2021 6:24:00 PM


হাঁটার ক্লান্তি ছিল। সাধু এসে মন্দিরের চারপাশে ঘুরে-টুরে বেড়ালেন। দশাংশিক চাতালে শুয়ে একটু বিশ্রাম নিতে লাগল। যখন উঠল, দেখল সাধু পূজারীর সাথে বেশ গল্প করছেন।
সাধু জিজ্ঞাসা করলেন, "কেমন লাগছে দশাংশিক? বেশ প্রসন্ন আর সতেজ মনে হচ্ছে তো?"
দশাংশিক ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাতেই পূজারী বললেন, "মহারাজ, আপনার শিষ্য উঠেছে, এবারে প্রসাদ গ্রহণ করুন। আপনাদের হলে, আমিও গ্রহণ করতে পারি।"
সাধু দশাংশিককে নিয়ে আঙিনায় বসলেন। খাওয়া শেষ হলে দশাংশিক দেখল সাধু মন্দির প্রাঙ্গণের ফুলের গাছগুলি দেখছেন মন দিয়ে।
দশাংশিক কাছে এলে সাধু তাকে নিয়ে গিয়ে বসলেন মন্দিরের চাতালে। পূজারীও উপস্থিত। সাধু তাঁর গল্প বলতে শুরু করলেন।
"এক রাজা ছিলেন সুধন্য। তাঁর রাণী অন্বিতা। রাণী তো সার্থকনামা, কিন্তু রাজা বড় অলস। রাজা তাঁর বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসলেও রাজকার্যের ভার মন্ত্রীদের উপরেই ন্যস্ত করলেন। রাজত্ব চালানোর মত কঠিন কাজ অলস রাজার ভালো লাগে না। কিন্তু রাজা আবার সন্দেহবাতিকগ্রস্থ। সুতরাং মন্ত্রীদের উপরেও নজর রাখার জন্য গুপ্তচর আছে। রাণী যতই সকলের সাথে সকলের সদ্ভাব, অন্বয় রাখার চেষ্টা করুন না কেন, সকলের মনেই ভয়, অসন্তোষ। স্বাভাবিক ভাবেই খরচের বহরও বিপুল। রাজ্যের মানুষ করের ভারে ন্যুব্জ। কিছুদিনের মধ্যেই রাজ্যে দেখা দিল প্রজাবিদ্রোহ।
চারিদিকে হাহাকার। খাদ্য নেই, চিকিৎসার অভাব। প্রজারা রাজার সৈন্যদলকেও ভয় পায় না। সে এক বিষম পরিস্থিতি। রাজা এরকম প্রস্তুতিও নিয়ে রাখলেন যে পালিয়ে নিজের আর রাণীর প্রাণ বাঁচাবেন। কিন্তু বিশ্বস্ত বলে মনে হল না কোন রাজকর্মচারীকেই। এমন সময় রাণীর গুরু চিদানন্দ এলেন রাজ্যে। এসেই রাজার প্রাসাদের সকল বন্দী পাখি ও বন্যজীবজন্তুকে মুক্ত করে ছেড়ে দিলেন যার যার নিজের নিজের পরিবেশে। এরপর রাজাকে নিয়ে রাজ্যের প্রজাদের সামনে উপস্থিত হয়ে বললেন, 'আপনারা আগামী চারমাসকাল ধৈর্য্য ধরুন। রাজাকে আমি জানিয়েছি রাজ্যের এই দুর্দশার কারণ কিছু বন্দী পশু-পাখি। তাদের জন্যই লক্ষ্মী রাজ্য ত্যাগ করেছেন। বিদ্রোহ করলে রাজা বদল হবে কিন্তু তাতে তো আর লক্ষ্মী ফিরে আসবেন না।'
প্রজারা এইটুকু শুনেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে শুরু করল। অল্প সময় পর কিছু গণ্যমান্য নাগরিক বললেন 'রাজ্যের লক্ষ্মীশ্রী তাহলে ফিরবে কীভাবে?'
চিদানন্দ বললেন, 'এই সহস্র সংখ্যক অলক্ষ্মী স্বরূপ পশু-পাখিদের মুক্ত করে দিলেই সব অকাল, মারী বন্ধ হবে। কিন্তু এই পশু-পাখিকে একমাত্র রাজাই চিনবেন ও মুক্তি দিতে পারবেন, তাই আপনারা নিজেরা নিজের নিজের কাজ ছাড়া আর কিছু করবেন না। রাজা নিজেই সারা রাজ্য ঘুরে এর প্রতিবিধান করবেন। এ জন্যই চারমাস সময় প্রয়োজন। এই সময়টুকু রাজাকে সাহায্য করুন। তারপরেও যদি অবস্থার পরিবর্তন না হয় তো আপনারাই রাজাকে সিংহাসনচ্যূত করবেন।'
প্রজারা রাণীমার গুরু চিদানন্দের নাম শুনেছে। অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন এই সন্ন্যাসীর প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাস সকলেরই প্রবল। তিনি নিজে যখন প্রতিবিধান বলেছেন তো চারমাস অপেক্ষা করে দেখাই যাক! বিদ্রোহ তো করলেই করা যাবে। সাধারণ প্রজা থেকে বিদ্রোহী সকলেই চারমাস অপেক্ষা করাকেই সমর্থন করল।
প্রাসাদে এসে রাজাকে চিদানন্দ বললেন 'সারা রাজ্যে, আমি গণনা করে দেখেছি এক সহস্র পশু-পাখি রয়েছে যারা কাজ না করে খায়। এদের মধ্যেই কিছু অলক্ষ্মী। কেউ শখে, কেউ দয়াপরবশ হয়ে কেউ বা অন্য কারণে এদের প্রতিপালন করে। তুমি শীঘ্রই এদের মুক্ত করে রাজ্যছাড়া করো। তাহলেই রাজ্যে লক্ষ্মী ফিরে আসবেন।'
চিদানন্দ একটু থেমে আরও বললেন, 'বৃদ্ধ ও অসুস্থ যারা তাদেরকে যে যেমন আশ্রয়ে আছে থাকতে দেবে।'
রাজা তো প্রাণের দায়ে, রাজ্যের দায়ে সেদিন থেকেই অনুসন্ধান শুরু করলেন। অবশ্য আর কোন উপায়ও ছিল না। উপায় থাকলে হয়তো রাজা এজন্যও কর্মচারী নিয়োগ করতেন!
রাজা প্রতি প্রজার বাড়ি যান, পশুপাখির খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন প্রত্যেকেরই পশুপাখির কোন না কোন উপযোগিতা আছে। কিন্তু সাথে সাথে আরও অন্যান্য অভাব-অভিযোগ, রাজ্যের বিভিন্ন ঘটনার সত্যতা-অসত্যতা এবং প্রশাসনিক ত্রুটি, অসাধুতা সবই রাজা নিজে জানতে পারেন। কিছুদিন পর রাজার মনে হল এতগুলো গুপ্তচর প্রায় সবই অসাধু! রাজাকে অন্ধকারে রেখে কেবল খরচ বাড়ানো। রাজা বাছাই করা সামান্য কয়েকজনকে রেখে বাকিদের জবাব দিলেন।
আরও কিছুদিন পর ধাপে ধাপে আরও অনেক রাজকর্মচারীর ছুটি হল। এদিকে প্রজারাও 'দেখাই যাক না কি হয়' মানসিকতার জন্য বিদ্রোহ-বিরোধিতা বাদ দিয়ে যে যার নিজের নিজের কাজ করছিল। এর ফলে চারমাসের মাথায় যেমন ফসল ফলল, বাণিজ্য বাড়ল তেমনই রাজার খরচ কমল কয়েকগুণ। একদিকে উপার্জন বাড়ল অন্যদিকে কর গেল কমে। বিদ্রোহের কথা আর বলে কে!
রাজাও খুশি। চিদানন্দকে আমন্ত্রণ করলেন রাজা। চিদানন্দ আসলে রাজা একান্তে জিজ্ঞাসা করলেন 'আমি তো সহস্র পশুপাখি মুক্ত করি নি গুরুদেব। সকলেরই তো পোষ্য কোনও না কোন কাজের। তাহলে এই অসম্ভব সম্ভব হল কীভাবে?'
চিদানন্দ বললেন, 'সহস্র মানে দশশত মাত্র নয়, অনেক বোঝাতেও সহস্র বলা হয়। আর অনেক অনেক বোঝাতে সহস্র সহস্র। সুতরাং সংখ্যার হিসেব দশ শত মাত্র ধরলে তোমার ভুল স্বাভাবিক রাজা।
আর যে আপন কর্ম না করে অন্নগ্রহণ করে সে ধর্ম পালন করে না। আর কে না জানে ধর্মপালন না করলে সে পশুপাখির তুল্য। তুমি সেইসব বেতনভূক পশুপাখিদের দূর করেছ, নিজেও আপন কর্মে নিযুক্ত হয়ে রাজধর্ম পালন করতে শুরু করেছ, এখন লক্ষ্মীর সাধ্য কি দূরে থাকেন!
রাজার বাগানে ফুলের উপর কিছু মৌমাছি উড়ছিল। চিদানন্দ সেদিকে দেখিয়ে রাজাকে বললেন, "এই মধুপ পতঙ্গ শুধু সভ্যই নয়, বেশ জ্ঞানীও। দেখো এদের। এরা ফুলে ফুলে মধু সংগ্রহ করে বেড়ায়, কিন্তু কখনই একটি ফুলকে নিঃস্ব করে নয়। ফুলের উপর অত্যাচার করে না বলেই ফুল বরং এদের আগমনের অপেক্ষা করে। আর এরা মধুর বিনিময়ে ফুলের নিষেক ঘটিয়ে ফলের, বীজের সৃষ্টি নিশ্চিত করে। অর্থাৎ এরাও আপন কাজে লিপ্ত ও ধর্মের পালন করে। সেজন্যই মধু উচ্ছিষ্ট না হয়ে বরং শুদ্ধ বলে পরিগণিত। সন্ন্যাসী তেমনই মাধুকরী করে নিজের জৈবিক চাহিদা মেটালেও কখনই সংসারী মানুষের উপর বোঝা হবেন না। বরং এই সংসার থেকে সংগৃহীত জ্ঞানরূপ মধু তিনি এই সৃষ্টির কল্যাণেই বিতরণ করবেন। এই তাঁর জীবিকা।
রাজা, আপন কর্মের দ্বারা উপার্জিত অন্নই সৎ অন্ন, বাকি সকলই কদন্ন।'
রাজা বুঝলেন এবং চিদানন্দ যখন বিদায় চাইলেন রাজা আর তাঁকে পূর্বের মত থেকে যাওয়ার অনুরোধ করলেন না।"
দশাংশিকও বুঝল মাধুকরীও বৃত্তি, কিন্তু সেও একপক্ষীয় নয়। মাধুকরী ভিক্ষা নয়। বরং পরিভ্রমণকারী সাধু তাঁর অর্জিত ও উপলব্ধ কাণ্ডজ্ঞান ও নীতিজ্ঞান সংসারী মানুষকে মাধুকরীর সময় বিতরণ করেন।








Card image cap     Tuesday, January 18, 2022
Events & Remarks


 

User Name:  

Passkey :  



Forget Passkey

Change Passkey

মন্তব্য, বিতর্ক ও আলোচনায় অংশ নিতে লগ ইন বা সাইন আপ করুন
Login/Sign Up to Remarks or to take part in Discussion/Debate.